প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের মানুষের জন্য রক্ত দিয়ে আমাদের রক্ত ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। আমাদেরও একটাই লক্ষ্য— তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত এবং উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করবো।

মঙ্গলবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে আয়োজিত এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত আলোচনা সভায় পূর্ব ধারণকৃত এক ভিডিও বার্তায় এসব বলেন প্রধানমন্ত্রী। ‘শোক থেকে শক্তি, শোক থেকে জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যেতে পারে না। আমাদের একটাই লক্ষ্য তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। বাংলাদেশকে জাতির পিতার ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর সেই প্রতিজ্ঞা নিয়ে সেই আদর্শ নিয়েই আমাদের পথচলা।

প্রধানমন্ত্রী ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, জাতীয় শোক দিবস আমাদের জন্য শোকের দিন, কষ্টের দিন। কিন্তু বাঙালি জাতির জন্য সব হারানোর দিন। আমি সব হারিয়েছি। আমি জানি হারানোর বেদনা খুব কষ্টকর। সেই কষ্ট সহ্য করে একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। সেই শোককে শক্তিতে পরিনত করে এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাই লক্ষ্য। ইনশাল্লাহ এই বাংলাদেশকে জাতির পিতার ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলবো। যে দেশের স্বপ্ন আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন ইনশাল্লাহ বাস্তবায়িত হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। জাতির পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ দেশের মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।

বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে গিয়ে জাতির পিতার জীবনের একটি বড় অংশ কারাগারে থাকার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা জীবনের সব থেকে মুল্যবান সময়টাই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। তাঁকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়, ফাঁসি দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে হয়রানি করা হয়। কিন্তু, সেই মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে যে হয়রানি করা হয়েছে বা এতবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে তবুও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলার মানুষের মুক্তি অর্জনের জন্য তিনি সংগ্রাম করে গেছেন এবং তাঁরই ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি স্বাধীনতা, আত্মপরিচয়, মর্যাদা, একটি ভুখন্ড ও একটি দেশ পেয়েছে। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি দিয়ে একটা উন্নত জীবন যাতে তারা পায় সেটাই জাতির পিতার একমাত্র লক্ষ্য ছিল।

মাত্র সাড়ে ৩ বছওে তিনি একটি যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশকে গড়ে তুলছিলেন। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে একটা যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশকে গড়ে তোলার পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সফলভাবে কাজ করে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত করেছিলেন। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন সেটা যদি বাস্তবায়ন করে যেতে পারতেন তাহলে বাংলার মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত জীবন পেতে পারতো। কিন্তু ঘাতকের দল সেটা হতে দেয়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের আসতে (দেশে) দেয়নি। পরবাসে জীবন কাটাতে হয়েছিল রিফিউজ্যি হিসেবে, নিজেদের পরিচয়ও পরিবর্তন করে। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর একরকম জোর করে দেশের ফিরে আসার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৮১ সালে দেশে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে রেহানার কাছে রেখে আমি চলে আসি বাংলাদেশে।

মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২শ’ ২৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে একটা মর্যাদা পেয়েছে। দারিদ্রের হার আমরা হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছি, ৪৫ ভাগ থেকে ২০ ভাগে নামিয়ে এনেছি। মানুষের গড় আয়ু আজকে ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এদেশের একটি মানুষও আর দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত থাকবে না এবং একটি মানুষও ভূমিহীন থাকবে না। জাতির পিতা ‘গুচ্ছগ্রাম’ কর্মসূচির মাধ্যমে খাসজমি বিতরণ এবং দরিদ্র জনগণকে ঘর তৈরী করে দেয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন- আমরা তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, বাংলাদেশে আর একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। কাজেই আমরা গৃহ নির্মাণ করে দিচ্ছি।

তাঁর সরকারের চিকিৎসা সেবা মানুষের দোড়গোঁড়ায় পৌঁছে দেয়া এবং প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষের সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে উন্নয়নের বিস্ময়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান (ইউজিসি) অধ্যাপক আবদুল মান্নান, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

আরও খবর