২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনে এবং ২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হয়। একই বছরের ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ৯ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে প্রথম কোনো ব্যক্তি মারা যান।

করোনা সংক্রমনের শুরুতে সবাই ছিলেন অন্ধকারে। এর চিকিৎসা বা প্রতিরোধের ছিল না কোন সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন। চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে একে একে প্রাণ হারান প্রথিতযশা চিকিৎসকের পাশাপাশি নবীন চিকিৎসকও।

পরিস্থিতি ছিল এমন, করোনা সন্দেহে সরকারি হাসাতালের গেইটেও অবহেলায় মারা গেছেন প্রসূতি। দুনিয়ার আলো দেখার আগে মায়ের সাথে পরপারে পাড়ি জমান অনাগত সন্তানও।

অবহেলিত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে সরকার করোনা চিকিৎসায় বিশেষায়িতভাবে গড়ে তুললো। বেসরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল এগিয়ে এলো করোনা চিকিৎসায়।

আর প্রাইভেট হাসপাতালের মধ্যে শুরু থেকেই করোনা চিকিৎসায় এগিয়ে আসে পার্কভিউ হসপিটাল। শুধু এগিয়ে আসছে বললে কমই বলা হবে। বলা চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার্কভিউ হাসপাতাল করোনা চিকিৎসায় নেতৃত্বও দিলো। রাত কিংবা দিন, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এটিএম রেজাউল করিম তার দক্ষ, অভিজ্ঞ চিকিৎসক দল নিয়ে পাশে থেকেছেন চট্টগ্রামের মানুষের পাশে।

চান্দগাঁওয়ের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম চট্টগ্রাম বার্তাকে বলেন- ‘মে ২০২০, করোনার প্রকোপ তখন বাড়ছেই। আমি স্ত্রীসহ করোনা আক্রান্ত। আগের ঘনিষ্ঠ সকল চিকিৎসা সেবীদের আচরণ বদলে গেলো। কেউ তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে রাজি হলেন না। ছেলের বন্ধুকে দিয়ে পার্কভিউতে যোগাযোগ করালাম। ডা. রেজাউল করিম একটাই কথা বলেলেন- “আমার হসপিটালে পাঠিয়ে দিন”। ওতটুকুতেই পার্কভিউতে যাওয়া। করোনামুক্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরছি তখন মনে হলো দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বছর ঘুরতেই আমার অতিশিপর চাচীও করোনা আক্রান্ত হন। বয়স্ক মানুষ বলে আমরাও চিন্তিত। তখনও একই অবস্থা, কেউ চিকিৎসা দিতে রাজি হলেন না। সেই পার্কভিউ, ডা. রেজাউল করিমই আমাদের পাশে থাকলেন। সপ্তাহ খানেক পর চাচীও সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরলেন।’

পার্কভিউতে করোনা চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তালিকায় আছেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা, একাধিক মন্ত্রী-সাংসদের স্বজন। এছাড়াও আছেন অন্য হাসপাতালের মালিকপক্ষের পাশাপাশি চিকিৎসকও। বাদ যাননি পত্রিকার প্রকাশক থেকে সম্পাদকও।

করোনাকালে শুধু করোনা চিকিৎসা নয়, অন্য সকল সেবা উন্মুক্ত রেখেছিল পার্কভিউ কর্তৃপক্ষ। কক্সবাজারের সব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হয়ে মিলন কর্মকার এলেন চট্টগ্রাম শহরে। আত্মীয়-স্বজন সবার দ্বারস্থ হয়ে সবার পরিচিতজনদের দিয়ে যোগাযোগ করেও পাইলসের অপারেশন করাতে পারছিলেন না কোথাও। এদিকে তার রক্তক্ষরণে অবস্থা খারাপের পথে।

তার শ্যালক বিষু কর্মকার বলেন, ‘আমরা পার্কভিউ হসপিটালের এমডি ডা. এটিএম রেজাউল করিমকে বিষয়টি জানাই। তিনি শুধু বললেন, আমার চিকিৎসকরা আমার সম্পদ। তবুও ঝুঁকি নিতে হবে। কারণ রোগী আমার আমানত। আমার দুলা ভাইয়ের অপারেশ হলো, তিনি এখন সুস্থ আছেন। করোনায় চিকিৎসা সেবা নিয়ে আমাদের পাশে পার্কভিউ ছিল। আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।’

কোন মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে এমন মহামারিতেও আপনারা চিকিৎসা সেবা উন্মুক্ত রেখেছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পার্কভিউ হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এটিএম রেজাউল করিম বলেন, ‘মন্ত্র একটাই, চিকিৎসক হিসেবে দেশ ও জাতির প্রতি আমাদের দায় বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই করোনাকালে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারিনি। আমরা আমাদের সামর্থের সবটুকু নিয়ে চেষ্টা করেছি, প্রথমে ১২টি পরে আরও ১২টিসহ ২৪টি আইসিইউ বেড করোনা চিকিৎসায় যুক্ত করেছি। শুরু থেকেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অক্সিজেন সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন রেখেছি আমরা।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজারের অধিক করোনা আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। ফ্লু কর্নারে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি রোগী।’

আরও খবর