মেহেদী হাসান মিরাজের ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানে একটি জায়গায় এত দিন ছিল ‘শূন্যে’র আধিপত্য। হ্যাঁ, এই শূন্যতা তিন অঙ্কের একটা ইনিংসেরই। ২৩তম টেস্ট খেলছেন, প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন ৪১টি; ওয়ানডে ৪৪, লিস্ট ‘এ’ ৯৩টি। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ মিলিয়ে খেলা হয়ে গেছে ৮৮টি ম্যাচ। কিন্তু সেঞ্চুরি একটিও করতে পারেননি। শতকের স্বাদ কেমন, সেটি এত দিন জানা ছিল না তাঁর। ক্যারিয়ারের প্রথম শতকটি করলেন এমন একটা মুহূর্তে, যখন সে ধরনের কিছুরই দরকার ছিল বাংলাদেশ দলের। একেবারে টেস্ট ক্রিকেটের মঞ্চে দাঁড়িয়েই প্রথম শতরানের গৌরব গায়ে মাখলেন তিনি।

 

২৩তম টেস্টে এসে নিজের সর্বোচ্চ সংগ্রহ দেখলেন তিনি। কিন্তু কে ভেবেছিল সেই ইনিংসটিই তিনি শতরানে রূপ দেবেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ফিফটিকে বড় করা, কিংবা সেটিকে শতকে পরিণত করার প্রবণতা এতটাই কম, তাই মিরাজের সেঞ্চুরিটি তাই ছিল আনন্দময় একটা ব্যাপারই। তাঁর ১৬০ বলে ১০৩ রানের ইনিংসটি অবশ্য পুরোপুরি কলঙ্কমুক্ত নয়। ২৪ রানে জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে প্রায় আউট হতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্য তাঁর সে যাত্রায় বেঁচে যান। সেই ওয়ারিক্যানের বলে সুইপ করেই নিজের প্রথম সেঞ্চুরিটি আদায় করে নিয়েছেন বাংলাদেশের এই তরুণ অলরাউন্ডার। শেষ পর্যন্ত রাকিম কর্নওয়েলের বলে লং অনে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন তিনি।

 

সেঞ্চুরির সম্ভাবনা ছিল সাদমান ইসলাম এবং সাকিব আল হাসানের সামনে। কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি করার পর তারা বেশিদুর এগুতে পারেননি। সাদমান আউট হয়েছেন ৫৯ রানে এবং সাকিব আউট হয়েছেন ৬৮ রানে। তবে, ২৬ মাস পর হাফ সেঞ্চুরি করে আর থেমে থাকেননি মেহেদী হাসান মিরাজ। অসাধারন ব্যাটিং করে নিজের ইনিংসকে টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মত তিন অংকের ঘর ছোঁয়ালেন বাংলাদেশের এই অফস্পিন অলরাউন্ডার।

 

ব্যাট করতে নেমেছেন আট নম্বরে। এই জায়গা থেকে সেঞ্চুরি করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু মিরাজ সেটা করে দেখিয়েছেন। ক্যারিবীয় বোলারদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ১৬০ বল খেলে সেঞ্চুরি করেন মিরাজ।

 

মিরাজ সেঞ্চুরি পূরণ করেছেন ইনিংসের ১৪৮তম ওভারে। জোমেল ওয়ারিকানের করা সেই ওভারের শুরুতে মিরাজ অপরাজিত ছিলেন ৯৩ রানে। প্রথম বলেই চার মেরে পৌঁছে যান ৯৭ রানে, পরের বলে নেন আরও ২ রান। সেঞ্চুরির জন্য তাড়া দেখাননি, তৃতীয় বল খেলেন ডট। চতুর্থ বলে প্যাডেল সুইপ করেই পৌঁছে যান ম্যাজিক ফিগারে।

 

বাংলাদেশের পক্ষে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে আট নম্বর বা তার নিচে নেমে টেস্ট সেঞ্চুরি করলেন মিরাজ। তার আগে মোহাম্মদ রফিক, খালেদ মাসুদ পাইলট, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, আবুল হাসান রাজু ও সোহাগ গাজীদের রয়েছে এ কীর্তি। তাদের পাশে নিজের নাম বসিয়ে দলীয় সংগ্রহটাও ৪৩০ রানে নিয়ে গেছেন ২৩ বছর বয়সী এ স্পিনিং অলরাউন্ডার।

 

আজ (বৃহস্পতিবার) দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই সাজঘরে ফিরে লিটন দাস, তখনও নতুন থাকা বল হাতে আক্রমণে শ্যানন গ্যাব্রিয়েল- মিরাজের জন্য চ্যালেঞ্জটা ছিল বেশ কঠিন। তবে গ্যাব্রিয়েলের মুখোমুখি তৃতীয় বলে বাউন্সার ডেলিভারিতে দারুণ দক্ষতায় পয়েন্ট অঞ্চল দিয়ে চার মেরে লড়াইয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তত ঘোষণা করেন মিরাজ। যা ধরে রেখে তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি।

 

লিটন আউট হওয়ার সময় বাংলাদেশের সংগ্রহ ২৪৮ রান। আড়াইশর আগে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ফেলায় দলীয় সংগ্রহটা বড় করার একটা চাপও ছিল মাথার ওপর। অপর প্রান্তে সাকিব আল হাসান ছিলেন সাহস দেয়ার জন্য। দুজন মিলে ষষ্ঠ উইকেটে গড়েন ৬৭ রানের জুটি। এ জুটিতে ভর করেই বাংলাদেশ পেরিয়ে যায় ৩০০ রানের কোটা।

 

পরে সাকিব ৬৮ রান করে আউট হলেও তাইজুল ইসলাম, নাইম হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমানদের নিয়ে শেষ তিন উইকেটে ১১৫ রান যোগ করেন মিরাজ। ব্যাটিংয়ে নেমে মিরাজ শুরু থেকেই খেলতে থাকেন রানের চাকা সচল রেখে। জোমেল ওয়ারিকানকে সুইপ কিংবা কেমার রোচের ফুল লেন্থের ডেলিভারি অনড্রাইভে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে আত্মবিশ্বাসের জানান দিয়েছেন তিনি।

 

ইনিংসের সেরা শট ছিল ইনিংসের ১১৭তম ওভারে। ওয়ারিকানের মিডল-লেগস্ট্যাম্পের ডেলিভারিতে ইনসাইড আউট শটে এক্সট্রা কভার দিয়ে দৃষ্টিনন্দন এক বাউন্ডারি হাঁকান তিনি। মধ্যাহ্ন বিরতির সময় তিনি অপরাজিত থাকেন ৪৬ রানে। বিরতির পর ফিরে কর্নওয়ালের ওভারে প্রথমে থার্ড ম্যানে ৩ রান নিয়ে পৌছান ৪৯ রানে, পরে ফাইন লেগ দিয়ে ২ রান নিয়ে পূরণ করেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি।

 

বাংলাদেশ ইনিংসের ৯৩তম ওভারের দ্বিতীয় বলে উইকেটে গিয়ে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে মিরাজ আউট হয়েছেন ১৫১তম ওভারের দ্বিতীয় বলে। মাঝের ৫৮ ওভারে বাংলাদেশ দল পেয়েছে ১৮২ রান, যেখানে মিরাজের একার অবদান ১০৩ রান।

 

প্রায় পৌনে ৪ ঘণ্টা উইকেটে থেকে ১৬৮ বল মোকাবিলা করে ১০৩ রানের ইনিংসটি খেলেছেন মিরাজ। যেখানে ছিল ১৩টি চারের মার, ছিল না কোনো ছক্কা। শেষপর্যন্ত অবশ্য আউট হয়েছেন ছক্কা হাঁকাতে গিয়েই। রাহকিম কর্নওয়ালের বলে ধরা পড়েছেন লংঅনে দাঁড়ানো কাভেম হজের হাতে।

আরও খবর