শেখ আনোয়ার

গত ক’মাসে দুনিয়ার তাবৎ শক্তিশালী নেতা-নেত্রীকে করোনার ভয়ঙ্কর অভিঘাত পুরোদস্তুর হেলিয়ে দিয়েছে। এমনকি মার্কিন মুল্লুকের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গদিও টলমল শোনা যায়। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি চৌপাট। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত বহুল আলোচিত অসুখ এ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। সভ্যতার ইতিহাসে খুব কম উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একটা অসুখ এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। যত দিন যাচ্ছে, সংক্রমিতের সংখ্যাও বাড়ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। ওষুধ নেই। তাই মুক্তির অন্য সব উপায় পরখ করা, দেখা এবং বোঝার জন্য বিজ্ঞানী গবেষকদের চেষ্টার কমতি নেই।

অন্য দেশের তুলনায় করোনায় বাংলাদেশে সুস্থতার হার বেশি। মৃত্যু হার কম। তবুও বিপুল জনঘনত্বের দেশে মানুষ একবার রাস্তায় বেরোলে গায়ে গায়ে ঠেসাঠেসি অনিবার্য। পেট বড় দায়। সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায়। এদেশে লকডাউন উঠে গেলেও অনেকে করোনা থেকে সুরক্ষার চেষ্টায় সতর্ক থাকেন। মাস্ক পরেন। হেক্সিসোল ব্যবহার করেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাইরের কাজ তড়িঘড়ি সেরে অনেকে অধিকাংশ সময় বাড়িতে কাটান। অনেকে আবার বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করছেন এখনো। বাড়িতে থাকার কারণে জীবাণুদের হাত থেকে ঠিকই হয়তো রক্ষা মিলছে। কিন্তু ঘরে বেশিক্ষণ থাকায় রোদের অভাব হচ্ছে না তো? যেহেতু বাড়ির বাইরে কম বেরোচ্ছেন, পর্যাপ্ত রোদ না পেলে শরীরে নানা সমস্যা এসে বাসা বাঁধতে পারে। ঘরে বসে থাকায় সবার পক্ষে সূর্যের দেখা না-ও মিলতে পারে। ছাদে হাঁটাহাঁটির সুযোগ সবার না-ও থাকতে পারে। এসব কারণেই বাড়তে পারে নানা শারীরিক সমস্যা।

অনেকে একটানা বাসায় বা অফিসে বসে থেকে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে কাজ করেন। ফলে সারাক্ষণ হাত-পা, কোমরে ব্যথা। কিন্তু খাবার সঠিকভাবেই খাচ্ছেন পর্যাপ্ত। করছেন শরীরচর্চাও। তবুও হাড়ের পেশীতে হঠাৎ টান ধরছে। ভিটামিন ডি-র অভাব নয় তো? কারণ ভিটামিন ডি ঠিকমতো তৈরি না হলে ক্যালসিয়াম কাজ করতে পারে না। রোদে একটুও না বের হওয়ার ফলে অনেক মানুষের এই প্রবণতা দেখা যায়। ঘর থেকে না বেরোনোর কারণে থাবা বসায় ছোটদের রিকেট থেকে শুরু করে বড়দের অস্টিওম্যালশিয়া, অস্টিওপোরেসিস নামের নানাবিধ অসুখ। এক নাগাড়ে ক্রমাগত কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, শরীরচর্চা না করা, জাঙ্কফুড খাওয়া, রোদ না লাগার ফলে বাড়ছে হাঁটু, কোমর ও অস্থিসন্ধির এমন যন্ত্রণা।

গবেষকদের মতে, করোনাকালের ক’মাসে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি সংক্রান্ত এ সমস্যা বেড়ে গেছে। শহরাঞ্চলে আধুনিক জীবনযাপনের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মহামারীর মতো বাড়ছে অস্টিওপোরোসিস। অথচ প্রায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ ভিটামিন ডি বিনা পয়সায় পাওয়া যায় সূর্যের আলো থেকে। ত্বকের মাধ্যমে শোষণ হয় সেগুলো। তাই প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট রোদে থাকতে পারলে শরীরের দরকারি ৪০ শতাংশ ভিটামিন ডি শোষিত হয় ত্বকে। কিন্তু এ সময়ে এ রুটিন মেনে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। অনেকে আবার তীব্র রোদে কালো না হতে, রোদ থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করেন। সানস্ক্রিন লোশন মাখলে শরীরে সূর্যের আলট্রাভায়োলেট রশ্মি না পৌঁছানোয় বেশিরভাগ নারী ভিটামিন ডি ঘাটতিতে ভুগে থাকেন।

শরীর বিজ্ঞানীরা জানান, ‘ভিটামিন ডি-র অভাব হলে কেবল হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা ব্যথা-বেদনা হয়, তা-ই শুধু নয়। তৈরি হতে পারে আরও বড় সমস্যা। পেশি নাড়াচাড়া করতেও প্রয়োজন হয় ভিটামিন ডি’র। এমনকি এর সাহায্য ছাড়া মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ু সারা শরীরে বার্তা পর্যন্ত পাঠাতে পারে না।’

করোনার ওষুধ নেই। তাই এ সময়ে বারবার জোর দেওয়া হচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। গবেষকরা জানান, রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি ছাড়া ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসদের প্রতিহত করা দুঃসাধ্য। ভিটামিন ডি’র অভাবে হাড়ের মধ্যে ঝাঁঝরা হওয়ায় এখন বেশিরভাগ মানুষের অস্থির কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। হাড়ের মধ্যে ক্যালসিয়াম ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে ভিটামিন ডি। এটি না থাকলে ক্যালসিয়াম হাড়ে ঢুকলেও মল-মূত্রের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এমনিতে অতিরিক্ত জাঙ্কফুড খাওয়ার ফলে এখন বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে পড়ুয়াদের মধ্যে জুভেনাইল অস্টিওপোরোসিস নামক অসুখ দেখা দিচ্ছে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, সারা বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ভিটামিন ডি-র অভাবে ভুগছেন। ভিটামিন ডি-জনিত ঘাটতিকে গ্লোবাল হেলথ প্রবলেম বলা হচ্ছে। ভিটামিন ডি-র সঙ্গে বসবাসে একাকিত্বের সংযোগের কথা বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে। ভিটামিন ডি’র অভাবে শরীরে সেরোটোনিন হরমোনের ক্ষরণ ঠিকমতো হয় না বলে আমেরিকার কয়েকটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

সূর্যের আলো করোনাভাইরাস ধ্বংস করতে পারে কি? ‘জ্বি, হ্যাঁ পারে।’ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি জানান, ‘এজন্যই দিনের বেলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘরের বাইরে রোদ পোহানো, শরীরচর্চা কিংবা দৈনন্দিন কাজ করাটা সব সময় বদ্ধ ঘরে বসে থাকার তুলনায় শ্রেয়। গবেষকদের ধারণা, হয়তো একারণেই দ্বীপজাতীয় কিছু দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ খুব কম। যদিও সূর্যের করোনাভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার ব্যাপারটা নতুন কোনো খবর নয়। করোনাভাইরাস নিষ্ক্রিয় করতে সূর্যের আলোর গুণাগুণ ব্যাপক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে গ্রীষ্মকাল একটি সুখবর নিয়ে আসে, যা বর্ষা কিংবা শীতকাল দিতে পারে না। আর সেই সুখবর হলো সূর্যের আলো ও তাপ করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। যা আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি।’ গবেষকরা দাবি করেন, ‘প্রায় ৯০ শতাংশ করোনাভাইরাস গ্রীষ্মের সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসার ১১ থেকে ৩৪ মিনিটের মধ্যে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩ ডিগ্রি ‘ল্যাটিটিউড নর্থ’য়ের দক্ষিণে থাকা শহরগুলোয় গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যে রোদ পড়ে তার সংস্পর্শে এলে ৯৯ শতাংশ করোনাভাইরাস নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া সম্ভব।’ তাই যারা গ্রীষ্মের রোদে বাইরে বিভিন্ন কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, রোদের কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসায় করোনাভাইরাস দুর্বল কিংবা নিষ্ক্রিয় হয়ে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই মানুষের শরীরে মৃদু ‘ইমিউন রেসপন্স’ তৈরি করে। এই ইমিউন রেসপন্স ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শরীর ভাইরাসের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আপন মনে তৈরি করার সুযোগ পায়।

বিজ্ঞানীরা সূর্যের আলোর করোনাভাইরাস ধ্বংস করার কার্যকরী গুণ দেখে হতবাক। এখন সূর্যের সেই প্রভাবকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ফার ইউভি-সি লাইট’। এ প্রচেষ্টা সফল হলে যেকোনো স্থানে ওই ‘ফার ইউভি-সি লাইট’ জ্বালিয়ে ৯৯.৯৯ শতাংশ ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেন গবেষকরা। ফোর্বস’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঠিকভাবে এবং সঠিকস্থানে এ বাতিগুলো বসানো গেলে যে স্থানে আলো পড়বে; সেই স্থানটি করোনাভাইরাস মুক্ত হতে সময় লাগবে মাত্র ২৫ মিনিট।

আর তাই, প্রতিদিন কিছুক্ষণ হলেও রোদে থাকুন। ছাদ না হলেও বারান্দা বা জানালা দিয়ে যে রোদ আসে, তা শরীরে লাগানো আবশ্যক। ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হবে। দুধ, ছানা এ জাতীয় খাবারে ভিটামিন ডি রয়েছে। প্রয়োজনে ভিটামিন ডি সরবরাহকারী ওষুধ সাপ্লিমেন্টস খেতে হবে। তবে এজন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যদি চিকিৎসকের নিষেধ না থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি পূরণ হতে পারে বলে পুষ্টিবিদরা জানান। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সাবধান বাণী উচ্চারণ করে আসছেন। আবহাওয়া একটু ঠান্ডা হলেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও বেশি হবে। যদি তা-ই হয়, তাহলে শীতকালে আমাদের দেশেও ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে। আসছে শীতে দ্বিতীয় ঢেউ এলে সেক্ষেত্রে প্রায়শ্চিত্তটা নিদারুণ হবে। যা থেকে নিরাপদ থাকার উপায় এখনই বের করা জরুরি।

আশার কথা, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিরা করোনাভাইরাসের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই আর যা-ই হোক, মাস্ক পরা বাদ দেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও খবর