উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
||
বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের এই রায়টি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৬ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়ে গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ বন্ধে অত্যন্ত কঠোর এবং বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে।আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই রায়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কন্যাসন্তান অবহেলা এবং কন্যা ভ্রূণ হত্যা (Female Foeticide) রোধ করা। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে লিঙ্গ পরিচয় আগে জানতে পারলে অনেক সময় গর্ভবতী মায়ের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং গর্ভপাতের মতো ঘটনা ঘটে। এটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং জীবনের অধিকারের পরিপন্থী। পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে (DGHS) নিচের নির্দেশনাগুলো পালনের আদেশ দিয়েছেন। কোনো ডাক্তার, নার্স বা টেকনিশিয়ান আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা অন্য কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করতে পারবেন না।আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টে সন্তানের লিঙ্গ (ছেলে না মেয়ে) কোনোভাবেই উল্লেখ করা যাবে না। এমনকি সাংকেতিক চিহ্ন বা মৌখিকভাবেও পরিবারকে জানানো যাবে না। হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো "এখানে গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ জানা যায়" মর্মে কোনো বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না। দিলে তাদের লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সারা দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য একটি বিশেষ গাইডলাইন তৈরি করতে বলা হয়েছে যা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে হবে। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে নিয়মিত প্রচার ও সেমিনারের মাধ্যমে এই আইনের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে। আদালত এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের রেফারেন্স দিয়েছেন। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ভ্রূণের নিরাপত্তা এবং মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছেলে বা মেয়ে ভেদে বৈষম্য দূর করতে লিঙ্গ গোপনীয়তা বজায় রাখা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। রায়ে একটি বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। যদি চিকিৎসাগত কারণে (যেমন: কোনো বংশগত বা জেনেটিক রোগ যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট লিঙ্গের শিশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে) লিঙ্গ জানা বাধ্যতামূলক হয়, তবেই কেবল বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা তা যাচাই করতে পারবেন। তবে সেটিও হতে হবে কঠোর গোপনীয়তার সাথে। এই রায় কার্যকর হওয়ার ফলে সমাজ ও চিকিৎসা খাতে বড় কিছু পরিবর্তন আসবে। গর্ভবতী মায়েদের ওপর ছেলে বা মেয়ে সন্তান নিয়ে যে সামাজিক চাপ তৈরি করা হয়, তা কমে আসবে। কন্যা ভ্রূণ হত্যা রোধ: অনৈতিক গর্ভপাত বন্ধে এটি একটি ঢাল হিসেবে কাজ করবে। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে কেবল স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়বে, অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল মেটানোর ব্যবসা বন্ধ হবে।হাইকোর্টের এই রায়ের মূল কথা হলো—"সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, তার সুস্থতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।" এটি কার্যকর করার দায়িত্ব এখন যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, তেমনি সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো লিঙ্গ পরিচয় জানতে ডাক্তারদের চাপ না দেওয়া। এই আইন অমান্য করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।