মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
সিটিজি বার্তা

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীনের 'চার দফা' পরকল্পনা, ইরানের পূর্ণ সমর্থন ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ


PRINCE DEY
PRINCE DEY
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীনের 'চার দফা' পরকল্পনা, ইরানের পূর্ণ সমর্থন ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রস্তাবিত 'চার দফা শান্তি পরিকল্পনা' ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্দুল রেজা রহমানি ফাজলি এই পরিকল্পনার প্রতি তেহরানের আনুষ্ঠানিক সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

বেইজিং/তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও উত্তেজনা নিরসনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রস্তাবিত চার দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। সোমবার (১১ মে, ২০২৬) বেইজিংয়ে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আব্দুল রেজা রহমানি ফাজলি এক বিবৃতিতে জানান যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই নিরাপত্তা এবং যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে চীন যে দূরদর্শী প্রস্তাব পেশ করেছে, ইরান তার সাথে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছে।

এই শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তাবটি মূলত সামনে আসে গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে, যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (এবং ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান) বেইজিং সফর করেন। সেই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেই শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য তার এই কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরেন। বেইজিং মনে করে, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের চেয়ে অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব প্রচেষ্টাই শান্তি ফিরিয়ে আনতে বেশি কার্যকর।

শি জিনপিং-এর 'চার দফা' শান্তি পরিকল্পনার মূল স্তম্ভসমূহ:

চীনা প্রেসিডেন্টের এই প্রস্তাবে চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা: ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান: কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা করা। এটি মূলত পশ্চিমা 'রেজিম চেঞ্জ' বা হস্তক্ষেপ নীতির বিপরীত একটি অবস্থান।

আন্তর্জাতিক আইনের শাসন: 'জঙ্গলের আইন' বা পেশিশক্তির ব্যবহারের পরিবর্তে জাতিসংঘ কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি মেনে চলা। বেইজিংয়ের মতে, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত, সুবিধাজনকভাবে ব্যবহারের বিষয় নয়।

উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সমন্বয়: নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়, আবার উন্নয়ন ছাড়া নিরাপত্তা টেকসই হয় না। তাই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা কৌশলকে একসাথে এগিয়ে নেওয়া।

২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপনে চীন যে ভূমিকা রেখেছিল, এই চার দফা পরিকল্পনা তারই ধারাবাহিকতা। চীন এখন নিজেকে কেবল বড় ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একজন নির্ভরযোগ্য 'শান্তি দূত' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।

ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্দুল রেজা রহমানি ফাজলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ইরান মনে করছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে চীনের এই বহুপাক্ষিক উদ্যোগ তাদের ওপর থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সহায়ক হবে।

আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সাথে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর ইরানের সমর্থন পাওয়াটা ইঙ্গিত দেয় যে, চীন একইসাথে সুন্নি ও শিয়া বিশ্বের দুই প্রধান শক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে সক্ষম। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

যদিও এই পরিকল্পনায় তাত্ত্বিকভাবে কোনো ফাঁক নেই, তবে মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন জটিল। বিশেষ করে চলমান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থার ওপর। তবে বেইজিংয়ের এই উদ্যোগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন ক্রমশ বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে।

শি জিনপিং-এর এই চার দফা পরিকল্পনা মূলত চীনের 'গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ' (GSI)-এর একটি অংশ। ইরানের এই আনুষ্ঠানিক সমর্থন বেইজিং ও তেহরানের কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল, যা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূএ: আল জাজিরা

আপনার মতামত লিখুন

সিটিজি বার্তা

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬


মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীনের 'চার দফা' পরকল্পনা, ইরানের পূর্ণ সমর্থন ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রস্তাবিত 'চার দফা শান্তি পরিকল্পনা' ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্দুল রেজা রহমানি ফাজলি এই পরিকল্পনার প্রতি তেহরানের আনুষ্ঠানিক সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

বেইজিং/তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও উত্তেজনা নিরসনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রস্তাবিত চার দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। সোমবার (১১ মে, ২০২৬) বেইজিংয়ে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আব্দুল রেজা রহমানি ফাজলি এক বিবৃতিতে জানান যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই নিরাপত্তা এবং যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে চীন যে দূরদর্শী প্রস্তাব পেশ করেছে, ইরান তার সাথে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছে।

এই শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তাবটি মূলত সামনে আসে গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে, যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (এবং ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান) বেইজিং সফর করেন। সেই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেই শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য তার এই কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরেন। বেইজিং মনে করে, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের চেয়ে অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব প্রচেষ্টাই শান্তি ফিরিয়ে আনতে বেশি কার্যকর।

শি জিনপিং-এর 'চার দফা' শান্তি পরিকল্পনার মূল স্তম্ভসমূহ:

চীনা প্রেসিডেন্টের এই প্রস্তাবে চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা: ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান: কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা করা। এটি মূলত পশ্চিমা 'রেজিম চেঞ্জ' বা হস্তক্ষেপ নীতির বিপরীত একটি অবস্থান।

আন্তর্জাতিক আইনের শাসন: 'জঙ্গলের আইন' বা পেশিশক্তির ব্যবহারের পরিবর্তে জাতিসংঘ কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি মেনে চলা। বেইজিংয়ের মতে, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত, সুবিধাজনকভাবে ব্যবহারের বিষয় নয়।

উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সমন্বয়: নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়, আবার উন্নয়ন ছাড়া নিরাপত্তা টেকসই হয় না। তাই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা কৌশলকে একসাথে এগিয়ে নেওয়া।

২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপনে চীন যে ভূমিকা রেখেছিল, এই চার দফা পরিকল্পনা তারই ধারাবাহিকতা। চীন এখন নিজেকে কেবল বড় ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একজন নির্ভরযোগ্য 'শান্তি দূত' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।

ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্দুল রেজা রহমানি ফাজলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ইরান মনে করছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে চীনের এই বহুপাক্ষিক উদ্যোগ তাদের ওপর থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সহায়ক হবে।

আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সাথে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর ইরানের সমর্থন পাওয়াটা ইঙ্গিত দেয় যে, চীন একইসাথে সুন্নি ও শিয়া বিশ্বের দুই প্রধান শক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে সক্ষম। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

যদিও এই পরিকল্পনায় তাত্ত্বিকভাবে কোনো ফাঁক নেই, তবে মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন জটিল। বিশেষ করে চলমান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থার ওপর। তবে বেইজিংয়ের এই উদ্যোগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন ক্রমশ বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে।

শি জিনপিং-এর এই চার দফা পরিকল্পনা মূলত চীনের 'গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ' (GSI)-এর একটি অংশ। ইরানের এই আনুষ্ঠানিক সমর্থন বেইজিং ও তেহরানের কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল, যা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূএ: আল জাজিরা


সিটিজি বার্তা

সম্পাদক: নুর আলম

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।